Type Here to Get Search Results !

Weston lovr.ভালো ছেলের সাথে কথা

0

আমি আমার দাদা দ্বারকানাথ 
 স্মরণ করিয়া হাসিমুখে রঞ্জন০কে আগ বাড়াইয়া লইল-সাথে সাথে সে গান ধরিয়া দিল— “ও কুবুজার বন্ধু,
কেমনেতে পাশরিলে রাই-মুখ-ইন্দু।”
কমল খঞ্জনী ফেলিয়া উঠিয়া গেল, মহন্ত আসিয়া কহিল, “উঠে এস রাই-কমল!” কমল কহিল, “আমার মাথা ধরেছে।”
মহন্ত আবার কহিল, “ছি, রঞ্জন বলবে কি?”
কমল হাতজোড় করিয়া আর্ত কাকুতিতে কহিল, “পায়ে পড়ি তােমার মহন্ত, আমায় দন্ধে মেরাে না!”
মহন্ত বাহির হইয়া গেল। কীর্তন-শেষে যে যার ঘরে ফিরিল, মহন্ত আবার আসিয়া কমলের মাথায় হাত বুলাইয়া কহিল- “রাই-কমল! মাথায় হাত বুলিয়ে দোব!”


কমলের আজন্মের বেদনার বাঁধ আজ টুটিয়া গিয়াছিল, সে কাঁদিয়া কহিল, “আজকের মতাে আমাকে মাপ কর মহন্ত, একটি রাত মহন্ত, একটি রাত!” মহন্ত কহিল, “একটি কথা শােন!”
কমল কহিল, “কাল মহন্ত, কাল।”
মহন্ত কহিল, “কাল আর হয়তাে বলা হবে না।”
আর কমল কহিল, “না বলা হয় ওগাে তুমি বলাে না আমারও শুনে কাজ নাই!” মহন্ত ধীরে ধীরে উঠিয়া গেল।
কমল তেমনিভাবেই পড়িয়া রহিল, দরজা খােলা, বাহিরে অন্ধকার, নিস্তব্ধ গ্রাম, শুধু রজনী-প্রবাহের একটা সন্ শব্দ, সে যেন কমলের বুকের কান্নার প্রতিধ্বনি। সে আসিয়া পা টিপিয়া ঘরে বশিল।
কমল চমকিয়া কহিল “কে?”
রঞ্জন কমলের গায়ে হাত দিয়া মৃদুস্বরে কহিল—“চিনি!” কমল শিহরিয়া উঠিয়া বসিয়া কহিল, “চুপ চুপ—শুনতে পাবে!” পাপ,সাপের মতােই তার প্রকৃতি, গােপনতার মধ্যেই তার বাস। কমল পাশ কাটাইয়া ঘরের বাহির হইয়া ছুটিয়া রস-কুঞ্জের দুয়ারে আছাড় খাইয়া পড়িল- “মহন্ত, মহন্ত!”
ঘরের মধ্যে হইতে যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে মহন্ত উত্তর দিল, “রাই-কমল!” বড় কষ্টে যেন মহন্ত দুয়ার খুলিতেছিল –কমল বাহির হইতে আপন বিপদ ভুলিয়া অতি বড় উদ্বেগে কহিল, “কি হল তােমার মহন্ত!”
দুয়ার খুলিয়া মহন্ত কমলের পায়ের কাছে অবশভাবে লুটাইয়া পড়িয়া কহিল, “তােমার কি হল রাই-কমল?”
দুঃস্বপ্ন স্মরণ করিয়া মানুষ যেমন শিহরিয়া উঠে, কমল তেমনিভাবে শিহরিয়া কহিল—“রঞ্জন এসেছিল!”
মহন্ত ব্যগ্রভাবে কহিল, “চলে গেছে?”
কমলি কহিল, “তােমার কি হল মহন্ত এমন করছ কেন?”
অতি যন্ত্রণায় মহন্তের দেহখানা আঁকিয়া বাঁকিয়া গেল, তাহারই মাঝে সে কহিল, –“বাঁচতে যে ইচ্ছে হচ্ছে রাই-কমল, আমাকে বাঁচাও, আমি বিষ খেয়েছি।” কমল মহন্তের বুকে মাথা ঠুকিয়া কহিল, “কেন, কেন তুমি এমন করলে?” “রঞ্জনের আসা যে সইতে পারলাম না, কমল—আমারই”—বিষের যাতনায় মহন্ত গােঙাইয়া উঠিল, মুখে ফেনা ভাঙিল।
কমল যত্নে মুখে ফেনা মুছাইয়া দিয়া কহিল, “সে তাে আমার নয় গাে, ছেলেবেলার সখা তাে আর সে নাই আমার;—আর তুমিই তাে তাকে নিয়ে এলে, কেন তুমি তাকে তাড়িয়ে দিলে না?”
যাতনার মাঝেও মহন্ত হাসিয়া কহিল—“রাধে রাধে, রাই-কমল, তা কি পারি? বৈরাগী ভিখেরীর জাত আমরা, হাসি আর মুখের মিষ্টিই তাে আমাদের সম্বল। আর শােন—” মহন্তের চেতনা যেন লুপ্ত হইয়া আসিতেছিল—কমল পাশ কাটাইয়া কহিল, “কাহাকে কহিল কে জানে,-বােধ করি বা সর্বকালে—সর্বস্থানে চির-চৈতন্যময় সেই গােবিন্দের চরণেই প্রশ্ন করিল—“আমি কি করব গাে? আমার কি হবে গাে?
কে উত্তর দেবে?
উপায়হীন নারী, আর কিছু করিতে পারিল না—শুধু প্রাণ ফাটাইয়া ডাকিল, ওই মরণপথের যাত্রীকে-“মহন্ত, মহন্ত!”
মহন্ত আবার অতি কষ্টে চক্ষু মেলিয়া কহিল, হা—শােন সেই কথাটা শােন, পাপ। আমারই মনের, পাপ তােমার নয়,—রাধারাণীর জাত তােমরা, গােবিন্দের লীলায় ঠাই—পাপ তােমাদের ছুঁতে পারে না গাে-উঃ-” যাতনায় আবার দেহখানা তাহার আঁকিয়া-বাঁকিয়া গেল, ফেনা ভাঙিয়া জিষ্টা বাহির হইয়া পড়িল। নিঃশব্দে কমল সেই দেহখানা কোলে করিয়া বসিয়া রহিল!
আরও পড়ুনঃ মুন্নির রোমান্টিক প্রেমের গল্প
মহন্তের সমাধি দিল কমল—সেই জোরালতার কুঞ্জতলে। সন্ধ্যায় সেখানে সে দীপটিও জ্বালিয়া দেয়, তাহারই সম্মুখে সে কীর্তন গায়। তেমনি গান এখনও আখড়ায় জমে, —তেমনি আনন্দ;-কমল হাসিমুখে সবাইকে আগ বাড়াইয়া লয়, হাসিমুখে কথা কয় ! আসে না শুধু একজন—সে রঞ্জন!
ভােলা কহে, “ডাকব!”
কমল হাসিয়া কহে, “আসবেন আপনি একদিন!”
লােকে কয়,-“হাসির ছটা-ঘটা দেখেচ! শহর-বাজারে যায় না কেন? ছি-ছি!” মেয়েরা বলে-“মরে না কেন,—যাকে দশে বলে ছি—তার জীবনে কাজ কি?” কমল হাসিমুখে কহে, “মনুষ্য জন্ম বহু ভাগ্যে হয়েছে, তা কি ছাড়তে পারি!
গােবিন্দ-গােবিন্দ।”
শুধু ওই কথা বলিয়াই ক্ষান্ত থাকে না, নিঃসঙ্কোচে গ্রামের অতিথি কুটুম্ব—এমন কি গ্রামের জমিদার আসিলে—সেখান পর্যন্ত সে পান হাতে হাসি পরিবেশন করিয়া আসে। জমিদার রসিকতা করিয়া কয়, “বৈষ্ণুবীর পান যেমন মিষ্টি, ঠোটের হাসি—তার চেয়েও মিষ্টি।”
বৈয়বী ঘােমটাটি ঈষৎ টানিয়া দিয়া আরও একটু হাসিয়া কয়—“ভিখেরীর ওই তাে সম্বল প্রভু!”
সেদিন পাড়ার রামের মা কহিল, “কমল শ্রীধাম যাবি? আমরা যাব ভচ্চাজ মহাশয়ের সাথে।”
বৈয়বী কহিল, “না।”
রামের মা কহিল, “সে কি লাে! ব্রজের চাদ!”
কমল কহিল, “ঠাকুরে আমার মন ওঠে না, রামের মা!” বলিয়া সে হাসিয়া সারা। রামের মা কহিল, “মরণ, তাের আবার হাসি আছে?”
কমল আবার হাসিয়া কহিল,-“ওই তাে আমার সম্বল গাে!” সরমের সীমারেখা পর্যন্ত জিভ কাটিয়া রামের মা পথে পথে বলিয়া চলিল—“কলঙ্কিনী কলঙ্কিনী।”
শ্রীধাম যাইবার অগ্রণী ভট্টাচার্য কহিল, “স্বৈরিণীর ওই লক্ষ্মণ যে, ও স্বৈরিণী।” ভােলা কহিল, “মারব মাগীকে।”
কমল বাধা দিয়া কহিল, “ছি!”
ভােলা কহিল,—“তা বলে,—ওই বলবে না কি?”
কমল সাঁঝের দীপটি সমাধিতলে দিতে দিতে গান ধরিল— “বড় ভালােবাসি আমি—কলঙ্কিনী—নাম গাে।
কলঙ্কের তরে আমি হারাই কি শ্যাম গাে।
শ্যামের আগে রাধায় দিয়ে ডাকে রাধাশ্যাম্ গাে৷” মুখে তার মধুর হাসি, চোখে তার আনন্দ, কোনাে অসূয়ানাই, আক্ষেপ নাই—এলাননা চুল, সে চুলের রাশি পরে খাঁজ কাটিয়া গলাটি বেড়িয়া অঞ্চলখানি। গাহিতে গাহিতে সে সমাধিতলে মাথাটি লুটাইয়া দিয়া গদগদ কণ্ঠে স্মরণ করে গুরু গুরু গুরু।”


Post a Comment

0 Comments