বুদ্ধিরাম শিশিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল। লেবেলে ছাপা অক্ষর সবই খুব তেজালাে।“ইহা নিয়মিত সেবন করিলে ক্রিমিনাশ, অম্ল ও অজীর্ণতা রােগের নিরাবরণ অবশ্যম্ভাবী।অতিশয় বলকারক টনিক বিশেষ। স্নায়বিক দুর্বলতা, ধাতুদৌৰ্ব্বল্য ও অনিদ্রা রােগের ও পরম ঔষধ। বড় বড় ডাক্তার ও কবিরাজেরা ইহার উচ্চ প্রশংসা করিয়াছেন।” ছাপাঅক্ষরের প্রতি বুদ্ধিরামের খুব দুর্বলতা। ছাপা অক্ষরে যা বেরােয় তার সবটাই তারবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে।
আদুরি অবশ্য অন্য ধাতের। বুদ্ধিরামের সঙ্গে তার মেলে না। বুদ্ধিরাম যা ভাবে,বুদ্ধিরামের যা ইচ্ছে হয় আদুরির ঠিক তার উল্টো হয়। বুদ্ধিরাম যদি নরম সরম মানুষ,তো আদুরি হল রণচণ্ডী। বুদ্ধিরাম যদি নাস্তিক, তাে আদুরি হল ঘাের আস্তিক। বুদ্ধিরামকে যদি কালাে বলতে হয়, তাে আদুরিকে ফর্সা হতেই হবে। বিধাতা (যদি কেউ থেকে থাকে) দুজনকে এমন আলাদা মালমশলা দিয়ে গড়েছেন যে আর কহতব্য নয়।আর সে জন্যই এ জন্মে দুজনের আর মিল হল না। বলা ভালাে, হতে হতেও হল না। এখন যদি বুদ্ধিরামের বত্রিশ-তেত্রিশ তাে আদুরির বয়স সাতাশ-আঠাশ চলছে।দুজনের কথাবার্তা নেই, দেখাশােনাও এক রকম কালেভদ্রে, মুখােমুখি যদি বা হয়।চোখাচোখি হওয়ার জো নেই। আদুরি আজকাল বুদ্ধিরামের দিকে তাকায়ও না।।কিন্তু বুদ্ধিরাম লােক ভালাে। লােকে জানে, সে নিজেও জানে। বুদ্ধিরাম আগাপাশতলা নিজেকে নিরিখ করে দেখেছে। হ্যা, সে তাে খারাপ নয়। মাঝে মাঝে বুদ্ধির দোষে দু-একটা উল্টো পাল্টা করে ফেললেও তাকে খারাপ লােক মােটেই বলা যাবে না।খারাপই যদি হবে তবে সাত মাইল পথ সাইকেলে ঠেঙ্গিয়ে চকবেড়ের হাটে কখনাে আসে মন্মথ সেনশর্মার পিওর আয়ুর্বেদিক টনিক ‘হারবল’ কিনতে? মাত্র মাসচারেক আগে প্লুরিসিতে ভুগে উঠল বুদ্ধিরাম। এখনাে শরীর তেমন জুতের নয়। কাকিরমুখে কথাটা শােনা গিয়েছিল, আদুরির নাকি আজকাল খুব অম্বল হয়। তা এরকম কতমেয়েরই হয়। কার তাতে মাথাব্যথা? বুদ্ধিরাম মানুষ ভালাে বলেই না খোঁজখবর করতে লাগল।
লোকজনের কাছে শুনল, হারবল খেতে তার পিসির অম্বলের ব্যথা সেরে গেছে।কথাটা মানিক মণ্ডলের কাছেও শােনা, হ্যা, হারবল জব্বর ওষুধ বটে, তিন শিশি খেতেনা খেতে তার বউ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। আর একদিন পরিতােষও কথায় কথায় বলেছিল,হারবল একেবারে অম্বলের যম। তবে পাওয়া শক্ত। মন্মথ কবিরাজ সেই শিবপুরের লােক, আশির ওপর বয়স। বেশি পারেও না তৈরি করতে। কয়েক বােতল করে ছাড়ে।দারুণ চাহিদা। চকবেড়ের হাটে একজন লােক নিয়ে আসে বেচতে।খবর পেয়েই আজ মঙ্গলবারে স্কুলের দুটো ক্লাস অন্যের ঘাড়ে গছিয়ে সাইকেল মেরে ছুটে এসেছে এত দূর। অশ্বত্থ গাছের গােড়ায় আধবুড়াে খিটখিটে চেহারার একটা লােক। ময়লা চাদর পেতে কয়েকটা বিবর্ণ ধুলাটে শিশি সাজিয়ে বসেছিল। ভারী বিরস মুখ।বুদ্ধিরাম জিজ্ঞেস করল, হারবল আছে? লােকটা মুখ তুলে গম্ভীর গলায় বলল, আছে। সতেরাে টাকা।সতেরাে টাকা শুনে বুদ্ধিরাম একটু বিচলিত হয়েছিল। দু শিশি কেনার ইচ্ছে ছিল।কিন্তু কুড়িয়ে বাড়িয়ে পকেট থেকে আঠাশ টাকার বেশি বেরলাে না।আচ্ছা, দু শিশি নিলে কনসেশন হয় না? লােকটা এমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের চোখে তাকাল যেন মরা ইদুর দেখছে। মুখটা অন্যধারে ফিরিয়ে নিয়ে বলল, পাচ্ছেন যে সেই ঢের। মন্মথ কবিরাজের আয়ু ফুরলাে বলে। তারপর হারবলও হাওয়া। মাথা খুঁড়ে মরলেও পাওয়া যাবে না।একটা শিশি কিনে বুদ্ধিরাম বলল, সামনের মঙ্গলবার আবার যদি আসি পাবাে তাে! বলা যাচ্ছে না। কথাটা যা-ই হােক সেটা বলার একটা রংঢং আছে তাে। লােকটা এমনভাবে বলাযাচ্ছে না’ বলল যা আঁতে লাগে। মানুষকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করাটাই যেন বাহাদুরি। বেচিসতাে বাপু কবরেজি ওষুধ, তাও গাছতলায় বসে, অত দেমাক কিসের!
আরও পড়ুনঃ গল্পঃ অনুরাধার স্বপ্ন
শিশিটা নিয়ে বুদ্ধিরাম হাটে একটু ঘুরে বেড়াল। চকবেড়ের হাট বেশ বড়। বেশ গিজগিজে ভিড়ও হয়েছে। চেনা মুখ নজরে পড়বেই। আশপাশের পাঁচ-সাত গাঁয়ের লােকই তাে আসে। বুদ্ধিরামের এখন চেনা কোনাে লােকের সঙ্গে জুটতে ভালাে লাগছে না। মাঝে মাঝে তার একটু একা বােকা থাকতে বড় ভালাে লাগে।জিলিপি ভাজার মিঠে মাতলা গন্ধ আসছে। ভজার দোকানের জিলিপি বিখ্যাত। শুধুজিলিপি বেচেই ভজা সাতপুকুরে ত্রিশ বিঘে ধানজমি, পাকা বাড়ি করে ফেলেছে। কিনেছে তিনটে পাঞ্জাবি গাই। ডিজেল পাম্প সেট আর ট্রাক্টরও। ঘেঁড়া গেঞ্জি আরহেঁটো ধুতি পরে এমন ভাবখানা করে থাকে যেন তার নুন আনতে পান্তা ফুরােয়। আজও ভজার সেই বেশ। নারকোলের মালার ফুটো দিয়ে পাকা হাতে খামি ফেলছে। ফুটন্ত তেলে। চারটে ছােকরা গামলা থেকে টাটকা জিলিপি শালপাতার ঠোঙায় বেচতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। রাজ্যের মানুষ মাছির মতাে ভনভন করছে দোকানের সামনে।বুদ্ধিরাম কাণ্ডটা দেখল খানিক দাঁড়িয়ে। ডান হাতে বাঁ হাতে পয়সা আসছে জোর।ক্যাশবাক্সটা বন্ধ করার সময় নেই। আর তার ভিতরে টাকাপয়সা এমন গিজগিজ করছে। যে, চোখ কচকচ করে। টাকাপয়সার ভাবনা বুদ্ধিরাম বিশেষভাবে না বটে, কিন্তু একসঙ্গে অতগুলাে টাকা দেখলে বুকের ভিতরটায় যেন কেমন করে। বুদ্ধিরাম বেঞ্চে একটা জায়গা খুঁজল। ঠাসাঠাসি গাদাগাদি লােক। সকলেই জিলিপিতে মজে আছে। এমন খাচ্ছে যেন এই শেষ খাওয়া। ভােমা ভােমা নীল মাছি ওড়াওড়ি করছে বিস্তর। ভিতরবাগে তিনখানা বেঞ্চের একটা থেকে দুজন উঠে যেতেই বুদ্ধিরামগিয়ে বসে পড়ল। এখনাে আশ্বিনের শেষে তেমন শীতভাব নেই। দুপুরবেলাটায় গরমহয়। উনুনের তাপ আর কাঠের ধোঁয়ায় চালাঘরের ভিতরটা রীতিমতাে তেতে আছে। বুদ্ধিরাম বসেই ঘামতে লাগল। পাশের লােকটা এখনাে জিলিপি পায়নি। বৃথা হাঁকডাক করছে, বলি ও ভজাদা,আধঘণ্টা হয়ে গেল হাঁ করে বসে আছি। দেবে তাে! দিচ্ছি বাপু, দিচ্ছি। দশখানা হাত তাে